ঠিক পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা! ১৯৭৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে খুব কাছ থেকে দেখি ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ সংলগ্ন একটি খাল খনন কাজে। আমরা সেখানকার এস কে হাসপাতালের বিপরীতে গুদারাঘাট দিয়ে নদীর চরে নেমেছিলাম খাল কাটতে। খাল কাটার কোদাল আমার উচ্চতা প্রায় সমান ছিল বলে, ‘মাটির টুকরি’ একহাত থেকে আরেক হাতে পৌঁছে দিয়েছি।
তখন আমি ময়মনসিংহ মুকুল নিকেতনের ছাত্র। দুর্দান্ত পায়ে নদীর পাড়ে হেঁটে আসছেন জিয়াউর রহমান, আমার স্যাররা বলছেন সালাম দাও। আমরাও সালাম দিলাম, প্রত্যুত্তরে তিনিও আমাদের সালাম গ্রহণ করলেন। তখন তিনি দেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। জেনারেল জিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরউত্তম, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, সেসময়ের রাষ্ট্রনায়ক আমার এতো কাছাকাছি কতটুকুই তার মর্ম বুঝি!

আবারো ১৯৭৯ সালে। আমার প্রথম হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং দেখা! হেলিকপ্টারে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে নামলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মুকুল ফৌজের মুকুলেরা তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম, নাসিমভাই আর জুনায়েদ ভাইয়ের নেতৃত্বে তিনি সালাম নিয়ে সার্কিট হাউজের ভিতরে যান। আমরা ফিরে আসি মহারাজা রোডের মুকুল ফৌজে। এতো বছর আগের একটি ছবিও আমার হাতে এসেছে, কী সব গৌরবোজ্জ্বল
দিন পাড়ি দিয়েছি আমরা।
১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু র্যালিতে আবারো দূর থেকে দেখা হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। শিশু র্যালির গেঞ্জি আর ক্যাপ পেয়ে কী সে আনন্দ আমাদের! উৎসবে যোগ দিতে আগেরদিনই ময়মনসিংহ থেকে পৌঁছেছিলাম রাজধানী ঢাকায়। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল তোপখানা রোডের পুরাতন ঢাকা শিশু হাসপাতাল ভবনে। ঐ ভবনটির কার্যক্রম তখনো শুরু হয়নি।
এর বছর দুই যেতেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন এই রাষ্ট্রনায়ক। সেদিন সকালেও জানিনা তাঁর মৃত্যু সংবাদ। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে ক্লাস চলাকালীন খবর এলো স্কুল ছুটি, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মারা গেছেন! মনে হলো তাঁকে দেখার অমূল্য স্মৃতিগুলো। সেদিন আমার শহরের প্রতিটি মানুষ ছিল বিস্মিত, ব্যথিত!
২ জুন ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজার খবর পেলাম। জানাজার আনুষ্ঠানিকতা সরাসরি প্রচারিত হবে বিটিভিতে। আমাদের শিক্ষক রতন দার (ময়মনসিংহ জেলা মুকুল ফৌজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আমীর আহাম্মদ চৌধুরী) বাসায় ছিল একটি সাদাকালো টেলিভিশন, সেটিই ভরসা। সবাই জড়ো হলাম মরহুম রাষ্ট্রপতির জানাজা দেখতে। ঢাকায় কী সেই মানুষের ঢল, টিভির স্ক্রিনে সবটা দেখে খুব মন খারাপ হলো! মানুষের সাথে মিশে যাওয়া এতো ভালোবাসার মানুষটাকে কারা মেরে ফেললো? টিভির ঘরে নীরবতা! কেউ কান্নায়, কেউ নীরব দোয়ায় বিদায় পর্ব শেষ হলো।
জানাজায় উপস্থিত তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। সেদিন আকস্মিক পিতৃহারা দুই পুত্রের জন্যও আমার বড় মায়া হলো, কান্না করলাম। জানাজার চিরন্তন নীরবতায় ডুবে থাকা আমার সমবয়সী তারেক রহমান, পাশে আরাফাত রহমান কোকো ছোটই ছিল সে। পিতার লাশ সামনে রেখে সন্তানদের কী মনে হয় তা বুঝি নাই। তখনো আমার বাবা আছেন, তারেক-কোকোর বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন! পিতাকে আর দেখবেন না কোনদিন, ভাবাই যায়না!

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়া সংসার আর দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরলেন। বেগম জিয়াও একবার ময়মনসিংহ এসেছিলেন। খোলা জীপে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন তিনি। সপরিবারে মহারাজা রোডের দোতলা বাসা (এখন ডেসট্রয়েড) থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম গোলাপের পাপড়ি, কিন্ত বেগম জিয়ার অপরূপ সৌন্দর্যে সেই গোলাপও ম্লান হয়ে যাচ্ছিল!
সময়ের সাথে সাথে স্কুল ছেড়ে কলেজ পর্ব। ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যুক্ত হলাম। ছাত্র ইউনিয়ন ছিল আমার সংগঠন। কর্মী হিসেবে কাজ করেছি সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সাথেও।
পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষে সাংবাদিকতায় প্রবেশ। ১৯৯৬ সালে দৈনিক মুক্তকন্ঠের ষ্টাফ রিপোর্টার হিসেবে জয়েন করি ঢাকায়। সাংবাদিকতার সূত্রে বেশ কয়েকবার দেখা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে। সর্বশেষ গণভবনে ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীর কুশল বিনিময়ে খুব কাছাকাছি কথা বলি নেত্রীর সাথে, শেষ সান্নিধ্য সেটাই। ঐ যে বললাম, নিজ চোখে দেখাটুকু জীবনেরই সঞ্চয়!
আজ তাঁদের সন্তান তারেক রহমান বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। পিতা-মাতার নেতৃত্ব ও মানুষকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা করার অনেক গুণাবলি উনার মধ্যেও প্রত্যক্ষ করি। রাজনৈতিক অনেক চড়াই-উৎরাই শেষে আজ তিনি সরকার প্রধান।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ হয়তো একটি শ্লোগানই নয়- ধারণা করি, এটি তাঁর বিশ্বাস, আমিও তাতে বিশ্বাস রাখলাম।