বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সংবাদ শিরোনাম :
যে মাটি ভিজেছিল শ্রমিকের রক্তে, সেই মাটি আজও ডাকে অধিকারের শপথে: ভুলি নাই, ভুলব না — ‘মুল্লুকে চলো’ উৎসবমুখর আয়োজনে “শ্রীমঙ্গলে শুরু হলো ভূমি সেবা মেলা ২০২৬” কমলগঞ্জে শুরু হলো “ভূমি সেবা সপ্তাহ ২০২৬” কমলগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক আব্দুল মোতালেব কমলগঞ্জে শ্রেণিকক্ষে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা! শ্রীমঙ্গলে শ্রমিকদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আহত ১৬ কমলগঞ্জে ‘দূর্নীতি বিরোধী বিতর্ক’ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন কমলগঞ্জে দূর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন কমলগঞ্জ বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভিসা নিয়ে সুখবর দিল যুক্তরাষ্ট্র মিড ডে মিলে অনিয়ম: বিদ্যালয়ে ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের নির্দেশ

যে মাটি ভিজেছিল শ্রমিকের রক্তে, সেই মাটি আজও ডাকে অধিকারের শপথে: ভুলি নাই, ভুলব না — ‘মুল্লুকে চলো’

প্রদীপ পাল / ৫৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

১৯২১ সাল। ব্রিটিশ রাজের নির্মম শোষণ আর চাবুকের আঘাতে দিশেহারা চা শ্রমিকরা বুকের ভেতর এক চিলতে মুক্তির আকাশ খুঁজেছিলেন। নিজ জন্মভূমি বা ‘মুল্লুকে’ ফিরে যাওয়ার আকুলতায় তারা সেদিন ঘর ছেড়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলন আর অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম যেন এই ভাগ্যবঞ্চিত মানুষদের কপালে জন্মসূত্রেই লেখা ছিল। আজ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ সেই কঠিন ও অন্ধকার জীবন থেকে আজও মেলেনি তাদের চিরস্থায়ী মুক্তি।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য—ওড়িশা, বিহার, মাদ্রাজ, মধ্যপ্রদেশ থেকে এই সরল-সোজা মানুষদের এ দেশে নিয়ে আসা হয়েছিল সোনালী স্বপ্নের লোভ দেখিয়ে। মাথা গোঁজার মতো নিজস্ব আবাস, সম্মানজনক রোজগার আর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সব মৌলিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাদের। বলা হয়েছিল, তারা আসছেন এক নতুন জীবন গড়তে। কিন্তু হায়! সবুজ পাতার নিচে যে এতটা রক্ত আর অশ্রু লুকিয়ে ছিল, তা তারা জানতেন না। এখানে এসে তারা দেখলেন—না আছে জীবনের নিরাপত্তা, না আছে মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা। আছে শুধু দাসত্ব, নির্যাতন আর নিদারুণ নিপীড়ন।

ব্রিটিশদের এই সুচতুর চালবাজি যখন শ্রমিকরা বুঝতে পারলেন, তখন তারা ঐক্যবদ্ধ হলেন। গর্জে উঠলেন এক হয়ে। সিদ্ধান্ত নিলেন, এই দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে তারা ফিরে যাবেন নিজ দেশে। শুরু হলো ঐতিহাসিক ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই যাত্রাপথও রক্তে রঞ্জিত হলো। ১৯২১ সালের ২০ মে, চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে স্টিমারের অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত শ্রমিকের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাল ব্রিটিশদের গোর্খা বাহিনী। মেঘনার জল লাল হলো শ্রমিকের তাজা রক্তে। শত শত লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হলো নদীতে, আর বাকিদের বন্দীর মতো পিটিয়ে আবার বাধ্য করা হলো এই বঞ্চনার উপত্যকায় ফিরে যেতে। আর সেই থেকে আজ অব্দি চা শ্রমিকরা এ দেশের বুকে এক পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক জাতি হিসেবেই রয়ে গেলেন।

​স্বাধীন দেশে পরাধীনতার দীর্ঘশ্বাস আজ ১০৫ বছর পেরিয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু চা শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। আজ এই স্বাধীন রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েও—ভূমিহীন পরবাসী: বংশপরম্পরায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই মাটির সেবা করেও, নিজেদের নামে “এক ছটাক” জায়গার মালিকানা তাদের নেই। আজও তারা বাগান মালিকের জায়গায় ভাসমান পরবাসীর মতো দিন কাটান। উচ্ছেদের আতঙ্ক তাদের নিত্যসঙ্গী।

মজুরির নামে প্রহসন: বর্তমানের এই আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের বাজারে মাত্র ১৮৯ টাকা দৈনিক মজুরিতে একটি পরিবারকে বেঁচে থাকতে হয়। এটি বেঁচে থাকা নয়, বরং দারিদ্র্যের চরম সীমার নিচে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া।

অধিকারবঞ্চিত জীবন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নত জীবনযাপনের মতো মৌলিক অধিকারগুলো আজও তাদের কাছে মরীচিকা। নেই কোনো রাষ্ট্রীয় বিশেষ মর্যাদা, নেই তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো সরকারি মহাপরিকল্পনা।

আজ ১০৫ বছর পরেও ‘চা শ্রমিক হত্যা দিবস’ কিংবা ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল ও ট্রাজিক দিনটি সরকারি কোনো স্বীকৃতি বা মর্যাদা পায়নি।

যে শ্রমিকদের রক্ত ও ঘামে ভেজা চা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছে, রাষ্ট্র আজ তাদের আপন সন্তান হিসেবে বুকে টেনে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের সাথে আচরণ করা হচ্ছে যেন এক অবহেলিত, সৎ মায়ের সন্তানের মতো।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রক্তের দাগ কখনো মুছে যায় না। মেঘনা ঘাটের সেই শহীদদের আত্মা আর বর্তমান প্রজন্মের চা শ্রমিকদের চোখের জল আজ এক হয়ে গেছে। শত বছরের এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্র যেদিন তাদের ভূমির অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নাগরিক মর্যাদা দেবে—সেদিনই কেবল পূর্ণতা পাবে ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন। শ্রমিকের রক্তে ভেজা মাটি আজো সেই অধিকারের শপথে ডাক দিয়ে যাচ্ছে।

প্রদীপ পাল
চা শ্রমিক ও প্রধান শিক্ষক
পাত্রখোলা চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়,কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।


আরো সংবাদ পড়ুন...
এক ক্লিকে বিভাগের খবর