২০২৫ সালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আগের বছর একই সময়ে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে ঢাকায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৯ জন এবং কুমিল্লায় ৮ জন নিহত হন। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে নিহত হন ৬ জন করে। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে ৫ জন করে এবং নরসিংদী ও যশোরে ৪ জন করে প্রাণ হারান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭ জন, নারী ৩ জন এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন, যা সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এই সহিংসতার অসম প্রভাবকে স্পষ্ট করে।
আসক জানায়, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। ‘তওহীদী জনতা’ নাম ব্যবহার করে ইতিহাস ও শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুর, নারী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ৩৮টি ঘটনার মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজত এবং তথাকথিত ‘গুলিতে’ বা বন্দুকযুদ্ধে ২৬ জন নিহত হন। থানায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২টি। ২০২৪ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন।
একই বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাজতি ৬৯ জন এবং কয়েদি ৩৮ জন। সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে সাংবাদিক ও কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন এবং পত্রিকা দুটির মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত।
আসক বলেছে, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ মানবাধিকার। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ ও মামলা-গ্রেপ্তারের আশঙ্কা গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করছে।
আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং প্রায় ৪,৮৪৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এদের মধ্যে তিনজন সাংবাদিক নিহত হন এবং চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার করা হয়।
২০২৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও জমি দখলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় একজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। একই সময়ে একটি বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মব গঠন করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হামলা, হত্যা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।