মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় পূর্বশত্রুতার জেরে একটি ধানের ক্ষেতে কীটনাশক ছিটিয়ে ফসল নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৩০ শতক জমির ধান সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। ঘটনাটি শুধু একটি কৃষক পরিবারের আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের ওপর নাশকতামূলক আঘাত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বুধবার (১ জুলাই) ভোরে উপজেলার পৌর এলাকায় গোবর্দ্ধ এ ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. আতাউর রহমান এ ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আতাউর রহমান জানান, সকালে খবর পেয়ে জমিতে গিয়ে দেখেন, তার ৩০ শতক জমির ধানে বিষ ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে পুরো ক্ষেতের ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী তাকে জানান, ভোরের দিকে একই গ্রামের আব্দুল মন্নানের ছেলে মনির মিয়াকে জমির পাশ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, অভিযুক্ত মনির মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমি ও ব্যক্তিগত বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে এ নাশকতা চালানো হয়েছে বলে তার ধারণা।

আতাউর রহমান আরও বলেন, ‘এই জমিতে ধান চাষ করতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ধান ঘরে তুলতে পারলে অন্তত ৫০ হাজার টাকার ফসল পাওয়া যেত। ধার-দেনা করে চাষ করেছি। এখন সব শেষ হয়ে গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মনির মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমাকে হয়রানি ও ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
এদিকে স্থানীয় কৃষক জহির মিয়া, মুকিদ মিয়া ও তনু মিয়া দাবি করেন, ‘অভিযুক্ত মনির মিয়ার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন কৃষকের ফসল নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে। তারা বলেন, রাতের আঁধারে বিভিন্ন সময় ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি করার কারণে এলাকায় তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।’

স্থানীয়রা জানান, কৃষিজমিতে পরিকল্পিত নাশকতা শুধু ব্যক্তি নয়, সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির জন্যও হুমকি। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানের কুশি গঠন বা শীষ বের হওয়ার সময় বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং সম্পূর্ণ ফলন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষিজমিতে বিষ প্রয়োগ করে ফসল নষ্ট করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অপরাধমূলক কাজ। ধান দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে জাতীয় সম্পদ নষ্ট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।’
কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কমর উদ্দিন বলেন, ‘ধানের জমিতে বিষ প্রয়োগের অভিযোগে একটি লিখিত আবেদন পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’