মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৫ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সংবাদ শিরোনাম :
কমলগঞ্জে নববিবাহিত স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, থানায় মামলা-অভিযোগ বন্যাকবলিত কমলগঞ্জে রুহি ফাউন্ডেশনের ত্রাণ বিতরণ, ১০৫ পরিবারের পাশে লন্ডনপ্রবাসী ড. হাজ্বী শাহ্ আলম মৌলভীবাজারে যুক্তরাজ্য প্রবাসী কাইয়ুম মিয়াকে ধরতে পুলিশের অভিযান কমলগঞ্জ ভূমি অফিসের সামনে বেহাল সড়ক,কাদা-পানিতে নষ্ট হচ্ছে পথচারীদের কাপড় দেশীয় ফলের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে আম্বিয়া কেজি স্কুলের দিনব্যাপী আয়োজন প্রবীণ ব্যবসায়ী আলহাজ্ব এম আর খানের মৃত্যুতে শোক, ৭ জুলাই দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নিখোঁজের ১৯ দিন পর স্বামীর বাড়ির উঠান থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির: প্রথম ধাপে ইউপি ও পৌরসভা মৌলভীবাজারে সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে বিএসএফের পুশইন, রাতে বিজিবির পুশব্যাক চায়ের জনপদে কনটেন্ট নির্মাতাদের প্রথম স্বীকৃতি

পর্দা নামল তিন দিনব্যাপী হারমোনি ফেস্টিভ্যালের

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: / ৩১ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, জাতিগত বৈচিত্র্য ও সম্প্রীতির অনন্য বন্ধনকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে তিন দিনব্যাপী ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল (সিজন-২)’। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আয়োজনে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত এ উৎসবের পর্দা নেমেছে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

তিন দিনের এ জমকালো আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় রোববার রাত ১১টার দিকে। উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখা।

সিলেট অঞ্চলে বসবাসরত ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার সমন্বয়ে উৎসবটি আয়োজন করা হয়। নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি, নৃত্য, গান, লোকজ পরিবেশনা, হস্তশিল্প প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নানা আয়োজন উৎসব প্রাঙ্গণকে পরিণত করে বৈচিত্র্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

অংশগ্রহণকারী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ছিল খাসিয়া, গারো, মনিপুরি, ত্রিপুরা, সবর, খাড়িয়া, রিকিয়াসন, বাড়াইক, কন্দ, রাজবল্লব, ভূইয়া, সাঁওতাল, ওরাও, লোহার, মুন্ডা, কুর্মী, ভূমিজ, বুনারাজি, গঞ্জু, মৃধা, তেলেগু, গৌড়, রবিদাস, পাইনকা, কৈরী/ভোজপুরী, কালিন্দি ও কড়া সম্প্রদায়।

আয়োজকদের মতে, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহাবস্থান এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কার্যকর উদ্যোগ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরিচিত করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরাই ছিল উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য।

পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ শ্রীমঙ্গলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল টেকসই সাংস্কৃতিক পর্যটনের প্রসার। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব লোকজ গান, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক স্টল বরাদ্দ করা হয়। সেখানে হাতে বোনা পোশাক, গহনা, ঐতিহ্যবাহী শিকারের সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক স্মারক প্রদর্শন ও বিক্রি করা হয়। দর্শনার্থীরা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পিঠাপুলির স্বাদ নেওয়ার সুযোগও পান।

উৎসবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের তৈরি হস্তশিল্প, পোশাক ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ কাড়ে। এর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতার বার্তাও উঠে আসে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে ‘কমিউনিটি-বেসড ট্যুরিজম’ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন বিকাশের লক্ষ্যও উৎসবের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। এই ধারণার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন কার্যক্রমের অংশীদার করে তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে পর্যটন সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে পর্যটনের সুফল সরাসরি স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এমন বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ‘হারমনি ডে’ বা ‘হারমনি উইক’, ভারতের নাগাল্যান্ডের ‘হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল’ এবং ক্রোয়েশিয়ার ‘হারমনি ফেস্টিভ্যাল’ উল্লেখযোগ্য।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩ দেখতে যাচ্ছি। সিলেট অঞ্চলের অসংখ্য বৈচিত্র্যকে আমরা এক মঞ্চে তুলে ধরতে পেরেছি, যা আমাদের জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয়। এ উৎসবে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ এক ছাদের নিচে মিলিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করেছেন। আগামীতে আরও বড় পরিসরে, আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে এ উৎসব আয়োজন করা হবে।’

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সালেহা বিনতে সিরাজ বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, সৌহার্দ্য ও ধৈর্য আমাদের এই আয়োজনকে সফল ও অর্থবহ করেছে। হারমোনি ফেস্টিভ্যালের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্য এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর উৎসবের সাজসজ্জা ও পরিবেশনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ভবিষ্যতে আরও নান্দনিক, বর্ণিল ও ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পোশাক, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সবার সামনে তুলে ধরা হবে।’

সালেহা বিনতে সিরাজ জানান, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-২ মূলত ডিসেম্বর মাসে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে তা বর্ষাকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল সিজন-৩’ আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে।

তিন দিনের এ আয়োজন শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। সংশ্লিষ্টদের আশা, হারমোনি ফেস্টিভ্যাল ভবিষ্যতেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে আরও শক্তভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


আরো সংবাদ পড়ুন...
এক ক্লিকে বিভাগের খবর