শীতের রুক্ষতা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে মৌলভীবাজারের পথে-প্রান্তরে ফুটে উঠেছে চিরচেনা ভাটফুল। সড়কের ধারে, গ্রামীণ মেঠোপথের পাশে, নদী-খাল-দিঘির পাড়ে—যেদিকে চোখ যায়, সাদা-হালকা বেগুনি রঙের থোকা থোকা ভাটফুলে যেন সেজেছে প্রকৃতি।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে ও গ্রামীণ প্রকৃতিতে অনাদর ও অবহেলায় বেড়ে ওঠা চিরচেনা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ভাটফুল তার অপরূপ সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে। সড়ক ও গ্রামীণ মেঠোপথের দুপাশে, নদী-খাল-দিঘি ও জলাশয়ের পাড়ে, গ্রামীণ পরিবেশের আনাচে-কানাচে ভাটফুল থোকায় থোকায় ফুটে আছে। এ ফুলের সৌন্দর্যে যেন চোখজুড়িয়ে যায়। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের বার্তা নিয়ে ফুটেছে ভাটফুল। মন কেড়ে নেওয়ার মতো সুন্দর হওয়ায় এ ফুল শোভা পাচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের হাতে। ছোট ছোট শিশুরাও খেলছে দৃষ্টিনন্দন এ ভাটফুল দিয়ে।

জানা গেছে, ভাট বা বনজুঁই একটি শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্লেরোডেনড্রাম ভিসকোসাম। ইংরেজি নাম হিল গেন্টারি বোয়ার ফ্লাওয়ার। ভাটফুল সাদার মধ্যে হালকা বেগুনি মিশ্রিত স্নিগ্ধ সুন্দর। এ ফুল পাঁচটি পাপড়ি নিয়ে ফুটে থোকায় থোকায়। এ ফুলের গন্ধ রাতে তীব্র হয়ে ওঠে। এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশে। অঞ্চলভেদে এটিকে বনজুঁই, ঘেটু ফুল, ভাইটা ফুল, ঘণ্টাকর্ণ নামেও পরিচিত। তবে ভাটফুল নামেই এ ফুলের পরিচিতি বেশি। সাধারণত বসন্তের প্রারম্ভেই ফুল ফুটতে শুরু করে। এ ফুল রাতে গন্ধ ছড়ায়।

ভাট শুধু সৌন্দর্যই বিলায় না, এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, ভাট গাছের সবুজ পাতায় রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার। এতে মানবদেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফাইবার থাকার কারণে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে সহায়তা করে। এর পাতায় অ্যান্টি-ডায়াবেটিক উপাদান আছে। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। এর পাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লোমেটরি উপাদান আছে বলে এটি শ্বাসযন্ত্রের রোগ নিরাময়ে সহায়ক। মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভাট গাছের পাতার জুড়ি নেই। হজমশক্তি বৃদ্ধিতেও ভাট গাছের পাতা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও এর পাতা, বীজ, ফুল ও ফল আদিকাল থেকেই আরও নানা রোগে ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কমলগঞ্জ উপজেলার ইউনানি চিকিৎসক ডা. রহিমা আক্তার ডলি বলেন, ‘ভাট একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় ঔষধি উদ্ভিদ। এটি প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের নানা রোগে ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রকৃতিতে ফাল্গুন মাস এলেই এই গাছে ফুল ফোটে। এতে প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের নতুন এক মাত্রা যোগ হয়। এ ফুলের সৌন্দর্য মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দিন দিন গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে ভাট গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভাটসহ বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা ঔষধি গাছ রক্ষায় আমাদের সবাইর এগিয়ে আসা উচিত।’
কমলগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফারুক আহমদ বলেন, ‘যে কোনো ফুলই সৌন্দর্যের উৎস। সবরকম ফুলই মানুষকে আকৃষ্ট করে। বসন্তের শুরুতে ফোটা ভাটফুল গ্রামবাংলার চিরচেনা ফুল। এ সময়টায় ভাটফুল প্রকৃতিতে রাজত্ব করছে। আমাদের পরিবেশের বিভিন্ন জায়গায় ফোটা এ ফুলের সৌন্দর্যে প্রকৃতি অলংকৃত হয়ে আছে।’