শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:০২ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সংবাদ শিরোনাম :

মাতৃভাষা রক্ষায় দুই তরুণের লড়াই

মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সাধারন সম্পাদক, কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব / ২২১ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

আপন ওঁরাও ও মিঠুন ওঁরাও। প্রথমজনের বাড়ি দেওয়াছড়া চা-বাগানে। পরেরজন থাকেন মিতিঙ্গায়। দুজনই কমলগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে স্নাতকের ছাত্র।

ওঁরাওদের নিজস্ব ভাষায় এখন আর বেশি লোক কথা বলতে পারে না। এখন দুই বন্ধু ওঁরাও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা কুরুখ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে চালু করেছেন একটি পাঠশালা। নাম কুরুখ ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র। সেখানে ২৫ জন ওঁরাও শিক্ষার্থী শিখছে ভাষাটি।

শুক্র ও শনিবার কলেজ বন্ধ থাকার সুবাদে টিলার ওপর একটি বাড়ির উঠানে মাতৃভাষার পাঠদান করান এই দুই তরুণ। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও বছরখানেক ধরে তাঁরা এই শিক্ষাকেন্দ্রটি চালু রেখেছেন। সরেজমিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের দেওয়াছড়া চা-বাগানের বাবনবিল টিলায় গিয়ে দেখা যায়, টিলার ওপরে একটি বাড়ির উঠানে চাটাইয়ের ওপর একদল ছেলেমেয়ে বসে আছে। সবার সামনে বই, খাতা ও কলম।

উচ্চৈঃস্বরে কুরুখ ভাষায় বিভিন্ন প্রাণী ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম শিখছে। সহভাষা বাংলা-ইংরেজিও শিখে নিচ্ছে তারা। শিখিয়ে দিচ্ছেন আপন ওঁরাও। আর তাঁকে সহযোগিতা করেন কমলগঞ্জের পার্শ্ববর্তী মিতিঙ্গা চা-বাগানের মিঠুন ওঁরাও। তাঁরা দুজন একই কলেজের, একই শ্রেণির শিক্ষার্থী।

তাঁদের লক্ষ্যও অভিন্ন—মাতৃভাষার চর্চাকে গতিদান। টিকিয়ে রাখতে চান ভাষাটি। স্বেচ্ছাশ্রমে কাজটি চলছে। এখন দরকার এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

যেভাবে চলে

প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার বিকেলে পাঠদান করা হয়। এখানে আসা শিক্ষার্থীরা আশপাশের বিভিন্ন প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নিয়মিত শিক্ষার্থী ২৫ জন। স্থানীয় দেওয়াছড়ার বাবনবিল টিলার আশপাশের ৬০টি পরিবারের সন্তানরা মাতৃভাষা চর্চার স্কুলে ভাষা শিখছে। তাদের অনেকেরই খাতা ও কলম থাকে না। আপন আর মিঠুন নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে তা কিনে দেন। শীত ও গ্রীষ্মকালে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করা যায়। সমস্যা দেখা দেয় বর্ষায়। বৃষ্টির সময় উঠানে বসিয়ে ক্লাস করানো সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত জায়গাও নেই যে ঘরে বসিয়ে পড়াবেন। তাই নির্বিঘ্নে পাঠদানের জন্য স্থায়ী একটি ঘর চান এই দুই তরুণ।

নবম শ্রেণির ছাত্র সুবলাল ওঁরাও বলে, ‘এখানে কুরুখ ভাষায় নিজস্ব বর্ণমালা ও পশুপাখির নাম শিখেছি। বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে কুরুখ ভাষায় কথা বলি। কিন্তু বাইরে অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে হয়। এই শিক্ষাকেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে এখন নিজেদের মধ্যে কুরুখ ভাষায়ই কথা বলি।’

আরেক শিক্ষার্থী সীমা ওঁরাও বলে, ‘আমরা এখন কুরুখ ভাষায় ছড়াও আবৃত্তি করতে পারি।’

তাঁরা বললেন

শিক্ষাকেন্দ্রটির উদ্যোক্তা আপন ওঁরাও জানালেন, কুরুখ ভাষা চর্চার পরামর্শ দিয়েছিলেন ভাষাবিজ্ঞানী সেলু বাসিত। পরে দীপংকর শীল ‘কুরুখ ভাষা শেখার প্রথম পাঠ’ রচনা করেন। তাঁরা এই ভাষার বই, অভিধান তৈরি করেছেন। ২০২২ সালের ৩ মার্চ লোকগবেষক আহমদ সিরাজের বাড়িতে এই শিক্ষালয়টি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বাবনটিলার লালসাই ওঁরাওয়ের বাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠিত। এখানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে সেই বছরের ৭ অক্টোবর থেকে।

মিঠুন ওঁরাও বলেন, ‘আমাদের মুরব্বিরা কুরুখ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু শিশু-কিশোর, যুবকদের অনেকেই ভাষাটি জানে না। কথাও বলে না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাটির চর্চা বাড়াতে এই উদ্যোগ। বছরখানেক ধরে স্কুলটি চালাচ্ছি। এখন একটি ঘর দরকার। সরকারি সুযোগ-সুবিধা মিললে মাতৃভাষা, নিজেদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা সহজ হবে।’

দেওয়াছড়া চা-বাগানের বাবনটিলা এলাকার জগবন্ধু ওঁরাও নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘নিজের ভাষায় কথা বললে আমাদের যে আলাদা পরিচয় আছে, এটা বোঝা যায়। আপন ও মিঠুন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছে। তাদের জন্য ন্যূনতম একটা সম্মানীর ব্যবস্থা করলে কাজটা আরো সহজ হবে।’

গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, ‘কুরুখ ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগী হলে বিপন্ন এই ভাষাটি রক্ষা পাবে।’

কুরুখ ভাষার বই প্রণয়নকারী লেখক দীপংকর শীল বলেন, বাংলাদেশে কুরুখ ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই। কুরুখ ভাষায় লোকসংগীত, গল্প, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদির চর্চা আছে। ভাষাটি এখন অনেকে ভুলতে বসেছে। তবে ভারতে ‘তোলং সিকিচ’ নামে ওঁরাও জনগোষ্ঠীর লিপি আছে। ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী, কমলগঞ্জে ওঁরাও জনসংখ্যা তিন হাজার ১৩৮। আশার কথা হলো, এখন কুরুখ ভাষার অভিধান তৈরির কাজটি হয়ে গেছে। সরকার উদ্যোগ নিলে বিপন্ন এই ভাষা রক্ষা করা সহজ হবে।


আরো সংবাদ পড়ুন...
এক ক্লিকে বিভাগের খবর