মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ) আসনটি দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির কোনো প্রার্থী এ আসনে বিজয়ী হতে পারেননি।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ইতিহাস ভেঙে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব)।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পোস্টাল ব্যালট ভোটসহ ধানের শীষ প্রতীকে হাজী মুজিব পেয়েছেন মোট ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা নূরে আলম হামিদী পেয়েছেন ৫০ হাজার ২০৪ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৩। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে এটিই বিএনপির প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যবধানের বিজয়।
দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক বিজয়ের পেছনে সংখ্যালঘু ও চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ও তার দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালান।
দীর্ঘ ২৬ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হাজী মুজিব চা বাগান শ্রমিক, ২৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু হিন্দু ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ফলে তাদের একচেটিয়া ভোট তিনি পান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয়তা পান।
হাজী মুজিবের জনপ্রিয়তা একদিনে তৈরি হয়নি। ২০০১ সালে তিনি প্রথম এ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন। তার শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন আওয়ামী লীগের সাতবারের এমপি ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ। এরপর থেকেই শুরু হয় তার বিরুদ্ধে মামলা, হামলা ও নানা নির্যাতনের অভিযোগ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শতাধিক মামলায় প্রায় চার বছর কারাবরণ করেন হাজী মুজিব। কারাবন্দী থাকাকালে তার ভাই শামীম আহমেদ, কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তার ব্যবসায়ও ধস নামে। পরিবার ও সমর্থকদের দাবি, পুলিশি অভিযানের কারণে ঈদের দিনেও তিনি বাড়িতে এসে জামাতে শরিক হতে পারেননি। এমনকি রমজানে ইফতার মাহফিলেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তার সমর্থকদের দাবি, ভোটের আগের রাতে অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ভোটের সকালে স্বল্প সময়ের সুষ্ঠু ভোটে তিনি প্রায় এক লাখ ভোট পান। এসব ঘটনা স্থানীয় জনগণের মনে প্রভাব ফেলে এবং তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ—দুই উপজেলায় মোট ১৮টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ২,৫০০ পোস্টাল ভোটারসহ মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৮। ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাদের মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী (বহিষ্কৃত) স্বতন্ত্র প্রার্থী ও চা বাগান মালিক, সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি।
দুই উপজেলায় মোট ভোট পড়েছে (বাতিলসহ) ২ লাখ ৭২ হাজার ২৯৪। গড়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, বিএনপির বৃহৎ কর্মীবাহিনীর বিরামহীন প্রচারণা এবং দল ঘোষিত ৯ দফা নাগরিক সুবিধা—বিশেষ করে কৃষি ও ‘ফ্যামিলি কার্ডথ কর্মসূচির ব্যাপক প্রচার—এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে। এসব কারণেই তারা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন বলে জানান অনেক ভোটার।থ
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রত্যাশা ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের ইতিহাস মিলিয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনে এবারের ফলাফল নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর জনগণ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, এটি আমার জন্য বড় সম্মান। মৌলভীবাজার-৪ আসনের মানুষের আস্থার মর্যাদা দিতে চাই। এলাকার উন্নয়ন, শান্তি ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রথম অঙ্গীকার।