
কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে মৌলভীবাজারে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না থাকায় জেলার বেশিরভাগ কওমী মাদ্রাসা এবার ঈদে চামড়া সংগ্রহ করেনি। এমনকি বিনামূল্যেও অনেক স্থানে চামড়া নিতে আগ্রহ দেখাননি কেউ। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন কুরবানি দাতারা। সারাদিন অপেক্ষার পরও কেউ চামড়া নিতে না আসায় অনেকেই বাধ্য হয়ে চামড়া মাটিচাপা দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ নদী ও জলাশয়ে ফেলে দিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মৌলভীবাজার পৌর শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের দিন সন্ধ্যার পর চামড়া নিয়ে আসেন বিক্রেতারা। তবে বাজারে ক্রেতা সংকট ছিল প্রকট। ব্যবসায়ীরা প্রতি পিস গরুর চামড়া মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনছেন। এতে পরিবহন খরচও উঠছে না বিক্রেতাদের।

জেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী বালিকান্দি বাজারে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চামড়া সংরক্ষণ ও বিক্রির ব্যবসা চলে আসলেও এবার ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা গেছে চরম অনীহা। অনেকেই শুধুমাত্র ঐতিহ্য ধরে রাখতেই সীমিত পরিসরে চামড়া সংগ্রহ করছেন।
বালিকান্দি বাজারের চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. শওকত বলেন, “আমাদের এলাকায় প্রায় ২০০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা চলছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চামড়া কিনে বিক্রি করার কোনো নিশ্চয়তা নেই। গত বছরের অনেক চামড়া এখনও বিক্রি করতে পারিনি। ট্যানারি মালিকদের কাছেও বিপুল পরিমাণ টাকা পাওনা রয়েছে। ১০০-১৫০ টাকায় যে চামড়া কিনছি, তাতেও লোকসান হবে।”

রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের একটি কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মিজান আহমেদ বলেন, “প্রতি বছর মাদ্রাসার পক্ষ থেকে চামড়া সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু গত বছর লোকসান হওয়ায় এবার আমরা সংগ্রহ করিনি। একটি চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যে খরচ হয়, বিক্রির সময় তা ওঠে না।”
জুবের আহমদ নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি ৪৫টি চামড়া সংগ্রহ করে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে শ্রম ও পরিবহন খরচও ওঠেনি।
একইভাবে তওফিক আহমদ নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, “দুপুর থেকে চামড়া নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছি। কিন্তু কেউ আসেনি। অন্য বছর কওমী মাদ্রাসার লোকজন এসে চামড়া নিয়ে যেতেন। এবার তারাও আসেননি। শেষে বাধ্য হয়ে কিছু চামড়া মাটিতে পুঁতে রেখেছি, আর কিছু মনু নদে ফেলেছি।”

কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী শরীফপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম খান জানান, তিনি তিনটি খাসি ও দুটি গরু কুরবানি দিয়েছিলেন। কিন্তু চামড়া বিক্রি করতে না পেরে সন্ধ্যায় সেগুলো মনু নদে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
জমশেদ আহমদ নামে এক বিক্রেতা বলেন, “প্রায় ৩৫টি চামড়া নিয়ে শহরে এসেছি। ব্যবসায়ীরা কিনতে চাচ্ছেন না। একজন মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা দাম বলেছেন। অথচ পিকআপ ভাড়াই গেছে ৩ হাজার টাকা।”
চামড়ার বাজার ধসের কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া, সংরক্ষণ খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সালাহ্উদ্দিন শুভ ,মোবাইল : 01710668127 ইমেইল : protidinermoulvibazar@gmail.com
© ২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | প্রতিদিনের মৌলভীবাজার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।