
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবুজ পাহাড় আর ঘন বনভূমির মাঝে অবস্থিত মৌলভীবাজার—যা ‘চায়ের রাজধানী’ নামে সুপরিচিত। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই জনপদ শুধু পর্যটনের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার বিস্তীর্ণ চা বাগানগুলোতে প্রতিদিন শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে তৈরি হয় দেশের সিংহভাগ চা।
শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমে টিকে আছে এই ঐতিহ্য। বর্তমানে দেশের মোট চা উৎপাদনের বড় একটি অংশই আসে এই জেলার ৯২টি চা বাগান থেকে—যার মধ্যে রয়েছে ৫টি সরকারি চা বাগান। তবে এই সম্ভাবনাময় শিল্প আজ পড়েছে চরম সংকটে। টানা পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় থমকে গেছে চা উৎপাদন। বিশেষ করে সরকারি পাঁচটি চা বাগানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানার কার্যক্রম।

সরেজমিনে মৌলভীবাজার জেলার চা উৎপাদন কারখানাগুলোতে গেলে দেখা যায়, বাগানগুলোতে মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা, যেখান থেকে উৎপাদনের কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সংরক্ষণ করা এই কাঁচা পাতাগুলো এখন পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে করে চা শিল্পে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয়। শুধু সরকারি বাগানই নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন চা বাগানগুলোর অবস্থাও একই। বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হয়ে আছে সব কারখানা। ফলে গত পাঁচ দিন ধরে কাজহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার চা শ্রমিক।

চা বাগানে কর্মরত চা শ্রমিকরা জানান, আমরা প্রতিদিন কাজ করে খাই। পাঁচ দিন ধরে কাজ বন্ধ, আয়-রোজগার কিছুই নাই। ঘরে বসে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। তবে সংকটের মাঝেও আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, ‘সরকারি ৫টি চা বাগানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। বাগানগুলোতে মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা—যেখান থেকে উৎপাদনের কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটে সেই কাঁচা পাতাগুলোই এখন পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে করে চা শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকারও—কমছে রাজস্ব আয়।
তিনি আরও বলেন, শুধু সরকারি বাগান নয়—ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানগুলোর অবস্থাও একই। কারখানার চাকা থেমে গেছে, বন্ধ হয়ে আছে উৎপাদন।’

ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ খাঁন বলেন, ‘এপ্রিল মাসের শুরুতেই প্রতিদিন গড়ে ৫–৭ ঘণ্টা লোডশেডিং করে আসছে। কিন্তু ২৬এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে দিনে মাত্র ১–২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, বাকি সময় সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। এই দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। জ্বালানির ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রায় ১লক্ষ ৮হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা মাচায় পড়ে রয়েছে, যা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এ অবস্থায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’

কমলগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের মাধবপুর ইউনিটের দায়িত্বরত ইনচার্জ মো. রহমতউল্লা জানিয়েছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ঝড়-তুফানের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ লাইন স্বাভাবিক রাখতে এবং দ্রুত পুনরায় চালু করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ধীরে ধীরে সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করার চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে দ্রুত পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক : সালাহ্উদ্দিন শুভ ,মোবাইল : 01710668127 ইমেইল : protidinermoulvibazar@gmail.com
© ২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | প্রতিদিনের মৌলভীবাজার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।