
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল—চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এক বিরল বিস্ময়—নাগলিঙ্গম বৃক্ষ। লম্বা গাছের কাণ্ডজুড়ে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা নয়নাভিরাম ফুল, তার অপূর্ব গন্ধ ও অদ্ভুত গঠন প্রতিদিনই টানছে দর্শনার্থীদের।
জেলার দুটি স্থানে বর্তমানে নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ও ফল ধরার খবর পাওয়া গেছে। এর একটি শ্রীমঙ্গলস্থ বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ক্যাম্পাসে, অন্যটি মির্জাপুর ইউনিয়নের শহরশ্রী গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদের বাড়িতে। এই দুই স্থানেই গাছগুলো এখন ফুলে-ফলে ভরপুর, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।

এই গাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—ফুল ও ফল শাখা-প্রশাখায় নয়, সরাসরি কাণ্ডে জন্মায়। গাঢ় গোলাপি ও হালকা হলুদের মিশেলে গড়া ফুলগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর সৌরভে মিশে থাকে গোলাপ ও পদ্মের ঘ্রাণ। ফুলের পরাগচক্র সাপের ফণার মতো আকৃতির, যা একে আরও রহস্যময় করে তোলে।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল নাগলিঙ্গম গাছটি এখন ফুল ও ফলে ভরপুর। সকাল-বিকাল পুরো এলাকা ভরে উঠছে এর মাদকতাময় সুগন্ধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা চা বাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই বিরল বৃক্ষ দেখেও মুগ্ধ হচ্ছেন।
জানা যায়, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন এই গাছটির চারা রোপণ করেন। তিন দশকে এটি বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে।

অন্যদিকে শহরশ্রী গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায়ও একই দৃশ্য। গাছটির গোড়া থেকে কাণ্ডজুড়ে ফুটে থাকা ফুলে প্রায় পাতাই দেখা যায় না। কুঁড়ি থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটন—সব ধাপেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য।
স্থানীয় দর্শনার্থীরা বলছেন, এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। গাছের কাণ্ডজুড়ে ফুল ফোটার বিরল দৃশ্য তাদের বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা এই গাছের সামনে ছবি তুলতে ভিড় করছেন।
লেখক ও কলামিস্ট এহসান বিন মুজাহিরের ভাষায়, ‘নাগলিঙ্গম আমাদের দেশে এক বিরল প্রজাতির গাছ। এই ফুল সচরাচর চোখে পড়ে না, ফলে অধিকাংশ মানুষের কাছেই এটি অপরিচিত রয়ে গেছে। বসন্তকালে যেমন শিমুল গাছের নিচে ঝরে পড়া ফুলে চারপাশ ভরে ওঠে, তেমনি নাগলিঙ্গম গাছের তলাও তার অসংখ্য পাপড়িতে এক অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করে।

নাগলিঙ্গম গাছ আকারে বেশ বৃহৎ। এর কাণ্ড ফুঁড়ে বের হওয়া লম্বা, লতার মতো শাখাগুলোতে একসঙ্গে ফুটে ওঠে হাজারো ছোট ছোট কুঁড়ি। সময়ের সঙ্গে সেই কুঁড়িগুলো রূপ নেয় টকটকে লাল পলাশ কিংবা শিমুলের মতো দৃষ্টিনন্দন ফুলে, যা আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। ফুলের পাপড়ি ও রেণুর গঠন এতটাই আকর্ষণীয় যে তা সহজেই যে কারও দৃষ্টি কাড়ে।’
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. ইসমাইল হোসেন জানান, ‘নাগলিঙ্গম বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ, যা ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। চারা রোপণের ১২-১৪ বছর পর গাছে ফুল আসে। গাছের কাণ্ড ভেদ করে বের হওয়া মঞ্জুরিতে একসঙ্গে ১০-২০টি ফুল ফোটে। একদিকে নতুন ফুল ফুটতে থাকে, অন্যদিকে পুরোনো ফুল ঝরে পড়ে—প্রকৃতির এক অনন্য চক্র।
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নাগলিঙ্গম গাছ যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। বিরল এই বৃক্ষ শুধু সৌন্দর্য নয়, বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুরুত্বেও অনন্য। ফলে দিন দিন এটি হয়ে উঠছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের নতুন আকর্ষণ। নাগলিঙ্গমের এই মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি এখনও তার অগণিত বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে আমাদের চারপাশেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সালাহ্উদ্দিন শুভ ,মোবাইল : 01710668127 ইমেইল : protidinermoulvibazar@gmail.com
© ২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | প্রতিদিনের মৌলভীবাজার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।